লোকসভা-বিধানসভার পর পৌর নিগমে ও দলীয় মনোনয়ন পেলেন না বিবেক পোদ্দার, শিলচরের প্রথম মেয়র পদ নিয়ে আলোচনায় থাকা হেভিওয়েট দের মধ্যে কেবল অমরেন্দ্র পালই বিজেপির প্রার্থী
দিলু দাস, ৮ সেপ্টেম্বর, শিলচর :
দীর্ঘ ১১ বছর পর প্রথমবারের মতো শিলচর পৌর নিগম নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়তে শুরু করেছে। শাসকদল বিজেপির প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পর একদিকে যেমন বহু প্রত্যাশিত নাম নিয়ে জল্পনার অবসান ঘটেছে, অন্যদিকে তালিকা ঘিরে শুরু হয়েছে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের চর্চা।
দীর্ঘদিন ধরে শিলচরের প্রথম মেয়র কে হবেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে একাধিক নাম ঘুরপাক খাচ্ছিল। সেই আলোচনায় ছিলেন শিলচরের সদ্য প্রাক্তন বিধায়ক দিপায়ন চক্রবর্তী, প্রাক্তন বিধায়ক দিলীপ কুমার পাল, ঝলক চক্রবর্তী এবং আইনজীবী অমরেন্দ্র পাল-সহ একাধিক পরিচিত মুখ। আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম ছিল বিশিষ্ট ব্যবসায়ী বিবেক পোদ্দার। তবে শেষ পর্যন্ত বিজেপির প্রকাশিত প্রার্থী তালিকায় এই হেভিওয়েট নামগুলোর মধ্যে কেবল ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের অমরেন্দ্র পাল স্থান পেয়েছেন।
বিবেক পোদ্দারের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীদের আলোচনায় তাঁর নাম উঠে এলেও শেষ পর্যন্ত টিকিট পাননি। এবার শিলচর পৌর নিগমের ১৩ নম্বর ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর পদে বিজেপির টিকিটের জন্য তিনি আবেদন করেছিলেন বলে জানা গেলেও, এবারও দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে—দলের নির্বাচনী কৌশলে কি বিবেক পোদ্দারের জন্য আপাতত কোনও জায়গা রাখা হয়নি?
তবে দিপায়ন চক্রবর্তী, দিলীপ কুমার পাল কিংবা ঝলক চক্রবর্তী আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয় মনোনয়নের জন্য আবেদন করেছিলেন কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য না থাকলেও মেয়র পদকে ঘিরে তাঁদের নাম দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় ছিল। একইভাবে সদ্য বিজেপিতে যোগ দেওয়া এবং অতীতে শিলচর পৌরসভা, বিধানসভা ও সাংসদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সুস্মিতা দেবের নামও রাজনৈতিক মহলে সম্ভাব্য মুখ হিসেবে আলোচিত হয়েছে। কিন্তু আনুষ্ঠানিক প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পর তাঁদের কারও নাম না থাকায় সেই জল্পনাতেও আপাতত ইতি পড়েছে।
বিজেপির প্রার্থী তালিকা বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট—দল এবার শুধুমাত্র পরিচিত বা দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মুখের ওপর নির্ভর না করে নিজস্ব নির্বাচনী হিসাব-নিকাশকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। মেয়র পদ নিয়ে আলোচনায় থাকা একাধিক হেভিওয়েটকে বাদ দিয়ে অমরেন্দ্র পালকে প্রার্থী করা সেই কৌশলেরই ইঙ্গিত বহন করছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক মহলের একাংশ।
অন্যদিকে শহর ও সংগঠনের পরিচিত কয়েকজন প্রাক্তন পৌর সদস্যও এবার দলীয় মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। ফলে বিজেপির অন্দরে প্রার্থী বাছাই নিয়ে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা নির্বাচনের ময়দানে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কয়েকজনের ক্ষোভ, অসন্তোষ এমনকি পদত্যাগের ঘোষণাও সামনে এসেছে। স্বাভাবিকভাবেই এর ফলে দলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত ক্ষোভ শেষ পর্যন্ত ভোটের বাক্সে কতটা প্রতিফলিত হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। কারণ কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের আওতায় থাকা পরিবারের সদস্যরা নিজেদের লাভের জন্য শাসক দলের পক্ষে ভোট দেবেন তা নিশ্চিত ভাবে বলা যায়। তাঁদের নিকট প্রার্থী কোন বিষয় নয় এবং বিরোধী দল ও এতো শক্তীশালি নায় এইটা ভালো করে জানেন শাসক দলের নেতারা।
শিলচর পৌর নিগমের নির্বাচনী লড়াইয়ে বিজেপি যে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সংগঠন, নির্বাচনী পরিকাঠামো এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব—সব মিলিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের দৌড়ে বিজেপি নিঃসন্দেহে অন্যতম প্রধান দাবিদার।
দলীয় প্রতীকে নির্বাচনে জয়লাভের পাশাপাশি টিকিট না পাওয়া প্রত্যাশীদের সক্রিয়তা, নির্দল প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামা এবং তাঁদের ব্যক্তিগত প্রভাব—এই তিনটি বিষয়ই বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে শিলচর পৌর নিগমের প্রথম নির্বাচিত বোর্ড গঠনের লড়াইয়ে বিজেপি এগিয়ে থাকলেও প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পরের পরিস্থিতি নতুন কিছু প্রশ্ন সামনে এনেছে। হেভিওয়েটদের বাদ দিয়ে তুলনামূলক নতুন সমীকরণে দল কতটা সফল হয় এবং টিকিট-বঞ্চিতদের ক্ষোভ কতটা ভোটে রূপান্তরিত হয়—তার উত্তর মিলবে নির্বাচনের ফলাফলে। শেষ পর্যন্ত প্রার্থী নয়, সংগঠন ও ভোটারের রায়ই ঠিক করবে শিলচর পৌর নিগমের প্রথম বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাবে।

