৫০ শয্যার ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট দ্রুত চালুর দাবিতে মুখ্যমন্ত্রীর দ্বারস্থ সিভিল হাসপাতাল দাবি কমিটি
চিকিৎসক- বিশেষজ্ঞ নিয়োগ, নিওনেটাল কেয়ার ইউনিট ও জরুরি অপারেশন থিয়েটার চালুর দাবি
শিলচর, ৪ সেপ্টেম্বর : শিলচর এসএম দেব সিভিল হাসপাতালে নির্মিত/প্রস্তাবিত ৫০ শয্যার ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট দ্রুত চালু করার দাবিতে এবার সরাসরি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দ্বারস্থ হল শিলচর সিভিল হাসপাতাল দাবি কমিটি। ইউনিটটি ২৪×৭ পরিষেবার উপযোগী করে তুলতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞ নিয়োগের পাশাপাশি পরিকাঠামোগত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে শুক্রবার কাছাড়ের জেলাশাসকের মাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে একটি স্মারকপত্র পাঠানো হয়।

কমিটির বক্তব্য, শিলচর শহর ও বৃহত্তর বরাক উপত্যকার সাধারণ মানুষের জন্য এসএম দেব সিভিল হাসপাতাল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে সংকটাপন্ন রোগীদের দ্রুত ও উন্নত চিকিৎসার স্বার্থে ৫০ শয্যার ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটটি কার্যকরভাবে চালু করা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, বিশেষজ্ঞ ও সহায়ক কর্মীর পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছাড়া এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটকে পূর্ণাঙ্গভাবে ২৪×৭ পরিষেবায় নিয়ে আসা সম্ভব নয়।
জরুরি ভিত্তিতে ১৩ ধরনের চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞ নিয়োগের দাবি
মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পাঠানো স্মারকপত্রে কমিটির পক্ষ থেকে মোট ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- মেডিসিন ও ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিশেষজ্ঞ — ন্যূনতম ৫ জন
- জেনারেল সার্জন — ন্যূনতম ৩ জন
- অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ — ন্যূনতম ১ জন
- চক্ষু বিশেষজ্ঞ — ন্যূনতম ১ জন
- কার্ডিওলজিস্ট (হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ) — ন্যূনতম ১ জন
- নিউরোলজিস্ট (স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ) — ন্যূনতম ১ জন
- পালমোনোলজিস্ট (ফুসফুস ও শ্বাসযন্ত্র বিশেষজ্ঞ) — ন্যূনতম ১ জন
- নেফ্রোলজিস্ট (কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ) — ন্যূনতম ১ জন
- অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট — ন্যূনতম ৩ জন
- আইসিইউ রেসিডেন্ট চিকিৎসক — প্রতি শিফটে ৫ জন
- রেডিওলজিস্ট — ন্যূনতম ৩ জন
- পেডিয়াট্রিশিয়ান (শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ) — ন্যূনতম ৩ জন
- মাইক্রোবায়োলজিস্ট/সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ — ন্যূনতম ২ জন।
কমিটির দাবি, শুধু চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করলেই হবে না। ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটের কার্যকর পরিষেবা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত সংখ্যক নার্স, টেকনিশিয়ান, প্যারামেডিক্যাল ও অন্যান্য সহায়ক কর্মী নিয়োগ করাও জরুরি।
নিওনেটাল কেয়ার ইউনিট ও জরুরি অপারেশন থিয়েটারের দাবি
স্মারকপত্রে আরও বলা হয়েছে, সরকারি নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী একটি নিওনেটাল কেয়ার ইউনিট স্থাপন ও কার্যকর করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সংকটাপন্ন রোগীদের জরুরি অস্ত্রোপচারের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ অপারেশন থিয়েটার চালু করার দাবিও জানানো হয়েছে।
কমিটির মতে, ক্রিটিক্যাল কেয়ার পরিষেবা, জরুরি অস্ত্রোপচার এবং নবজাতকদের চিকিৎসা—এই তিনটি পরিষেবা পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই সামগ্রিক পরিকাঠামো গড়ে না তুললে হাসপাতালটির আধুনিকীকরণের উদ্দেশ্য পূরণ হবে না।
জলাশয়ের বেহাল দশা নিয়েও পৃথক চিঠি
এদিকে এসএম দেব সিভিল হাসপাতাল চত্বরে থাকা জলাশয়ের বেহাল দশা নিয়েও পৃথকভাবে সরব হয়েছে কমিটি। হাসপাতালের জলাশয়টি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলায় ধ্বংসের মুখে পড়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। বিশেষ করে জলাশয়ের পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকের পরিস্থিতি অত্যন্ত শোচনীয় বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
জলাশয়টি রক্ষা ও সংস্কারের জন্য দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানিয়ে পিডব্ল্যুডি বিল্ডিং ডিভিশনের উদ্দেশ্যে পৃথক চিঠি জমা দিয়েছে কমিটি। প্রয়োজনে মাটি ফেলে ক্ষতিগ্রস্ত অংশের সংস্কার ও জায়গাটি সুরক্ষিত করার পাশাপাশি জলাশয়টির সামগ্রিক সংস্কার ও পুনর্নির্মাণের দাবিও জানানো হয়েছে।
প্রশাসনের বিভিন্ন মহলে স্মারকপত্র ও চিঠির প্রতিলিপি
শুক্রবার কমিটির পক্ষ থেকে মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে পাঠানো স্মারকপত্রের প্রতিলিপি জয়েন্ট ডিরেক্টর সুমনা নাইডিঙ, এডিসি (হেলথ) এবং কাছাড়ের জেলাশাসকের হাতে তুলে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে সিভিল হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্টের কাছেও স্মারকপত্রের প্রতিলিপি জমা দেওয়া হয়।
জলাশয় সংক্রান্ত চিঠির বিষয়টিও জয়েন্ট ডিরেক্টরকে অবহিত করে তার প্রতিলিপি দেওয়া হয় এবং হাসপাতালের সুপারকেও লিখিতভাবে জানানো হয়।
এদিন স্মারকপত্র ও চিঠি প্রদানের সময় শিলচর সিভিল হাসপাতাল দাবি কমিটির পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন হানিফ আহমদ বড়ভূঁইয়া, শিপ্রা চক্রবর্তী, দীপঙ্কর চন্দ, খাদেজা লস্কর, কমল চক্রবর্তী-সহ অন্যান্য কর্মকর্তারা।
সাধারণ মানুষের স্বার্থেই দ্রুত পদক্ষেপের আবেদন
কমিটির পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, এই দাবি কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে নয়; শিলচর ও আশপাশের সাধারণ মানুষের উন্নত সরকারি চিকিৎসা পরিষেবা নিশ্চিত করার স্বার্থেই এই উদ্যোগ। সংকটাপন্ন রোগীদের বাইরে রেফার করার পরিবর্তে শিলচরেই যাতে দ্রুত ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া যায়, সেই লক্ষ্যেই ৫০ শয্যার ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটকে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করার দাবি জানানো হয়েছে।
এখন মুখ্যমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলি বিষয়টি কতটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে এবং দ্রুত কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছেন শিলচরের সাধারণ মানুষ।